আদমবেপারী হাসান মোল্লা চক্রের বিরুদ্ধে মামলার তাগিদ এসপির
প্রধান প্রতিবেদক ॥ লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালির উদ্দেশ্যে যাত্রা করার ২ মাস ৮ দিন পরও খোঁজ মেলেনি হবিগঞ্জের ৩৮ তরুণের। জেলা পুলিশ মানবপাচার চক্রে জড়িত আলোচিত হাসান মোল্লাসহ আটজনকে নোটিশ দিয়েছে এবং তাদের নামে মামলা দায়েরের জন্য পরিবারের প্রতি আহবান জানিয়েছে।
গত সোমবার হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মোছাঃ ইয়াছমিন খাতুন সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দৈনিক খোয়াই’র প্রধান প্রতিবেদক ও বাংলানিউজ এর জেলা প্রতিনিধি বদরুল আলমের নিকট থেকে ঘটনা জানেন।
পরে তিনি বলেন, “ঘটনাটি যেহেতু জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়েছে তাই হাসান মোল্লার নামে কোনো না কোনো ব্যক্তির অভিযোগ দিতেই হবে। পুলিশ বাদী হওয়ার তুলনায় ভুক্তভোগীর পরিবার বাদী হলে মামলা
সরকারের পক্ষে সহজে পরিচালনা করা যায়। যে কোনো পরিবারের একজন সদস্য থানায় গিয়ে মামলা দায়ের করলে পুলিশ ব্যবস্থা নিবে। অভিযুক্তদের দেশত্যাগ রোধের বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
এছাড়া হাসান মোল্লার চার সহযোগী-মোস্তাকিম, তফছির, মিজান ও সোহাগকে অনুসন্ধানের স্বার্থে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রবাস কুমার সিংহের কার্যালয়ে উপস্থিত করানোর জন্য আজমিরীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, লিবিয়ার কারাগার, হাসপাতালসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নিয়েও তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস।
নিখোঁজদের প্রতিটি পরিবার ইতালি পাঠানোর আশায় স্থানীয় ‘আদম বেপারি’ হাসান মোল্লার হাতে ১৭ থেকে ২০ লাখ টাকা করে দিয়েছেন। এখন প্রিয়জনের মৃত্যুর আশঙ্কায় পরিবারগুলো আতঙ্কগ্রস্ত। ভয় ও অনিশ্চয়তার কারণে কেউ মুখ খুলছেন না, আইনি পদক্ষেপেও যাচ্ছেন না।
উল্লেখ্য, গত ৩০ সেপ্টেম্বর ইতালিগামী নৌকায় ত্রিপলি উপকূল থেকে যাত্রা শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় স্বজনদের। বিষয়টি নিয়ে দৈনিক খোয়াই ও বাংলানিউজে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করলে ওই তরুণদের সন্ধান ও উদ্ধারে উদ্যোগ নিতে লিবিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাসকে নির্দেশ দেয় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। তারাও কোনো সন্ধান পায়নি।
বাংলাদেশ দূতাবাস, লিবিয়ার প্রথম সচিব মোঃ রাসেল মিয়া জানান, যুবকরা বিভিন্ন দেশ হয়ে লিবিয়ায় প্রবেশ করেছেন। তাদের সঠিক তথ্য আমাদের কাছে থাকে না। দেশ থেকে চিঠি পাওয়ার পর সম্ভাব্য কারাগার ও হাসপাতালগুলোতে খোঁজ নিয়েছি, কিন্তু সেখানে তাদের পাওয়া যায়নি। রেড ক্রিসেন্টসহ অন্যান্য মানবিক সংস্থাও কোনো তথ্য দিতে পারেনি।
তিনি আরও বলেন, যদি তারা মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি থাকতেন, তবে নিশ্চয়ই মুক্তিপণের জন্য বাড়িতে খবর দিত। আবার হাসপাতালে বা জেলে থাকলেও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করত। এখন একমাত্র সংশ্লিষ্ট দালাল বা আদম বেপারিই আসল তথ্যটা জানে। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে তারা সাগরে ডুবে মারা গেছেন।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর লিবিয়ার ত্রিপলি থেকে ইতালির উদ্দেশ্যে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে চারটি নৌকা ছেড়ে যায়। এর মধ্যে একটি নৌকায় হবিগঞ্জের ৩৮ জনসহ প্রায় ৯০ জন ছিলেন, সেই নৌকাটিই নিখোঁজ হয়েছে। বাকি তিনটি নৌকা ইতালিতে পৌঁছেছে।
আজমিরীগঞ্জের পশ্চিমভাগ গ্রামের লিবিয়া প্রবাসী হাসান আশরাফ ওরফে হাসান মোল্লার মাধ্যমে ওই ৩৮ জন ১৭ থেকে ২০ লাখ টাকা করে দিয়ে ইতালি যাওয়ার উদ্যোগ নেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হবিগঞ্জসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লিবিয়ায় নিয়ে বাংলাদেশি তরুণদের ইতালিতে পাঠানোর ‘দালাল’ হিসেবে একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করেছেন হাসান মোল্লা। মাত্র ছয় মাসে প্রায় এক হাজার মানুষকে ইতালিতে পাঠিয়ে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক মহলে।
অভিযোগ রয়েছে, ত্রিপলির উপকূল থেকে ভূমধ্যসাগরে ১০ ঘণ্টার নৌপথে মানুষ ইতালি পৌঁছে দেন হাসান। ছয় মাসে এ ব্যবসা থেকে তিনি অর্জন করেছেন শতকোটি টাকা। ৩৮ বাংলাদেশিসহ ৯০ জন নিখোঁজ হওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে হাসানের এ ‘আদম ব্যবসা’।
