পিটিআইয়ে নেশাখোরদের দৌরাত্ম
প্রধান প্রতিবেদক ॥ হবিগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (পিটিআই) কমপ্লেক্স এখন জরাজীর্ণ ও অব্যবস্থাপনার চিত্র বহন করছে। একসময় যেখানকার পরিবেশ ছিল পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও প্রাণবন্ত— সেটিই এখন পরিণত হয়েছে কচুরিপানায় ভরা পুকুর, নোংরা ড্রেন, ঝোঁপঝাড় আর মাদকাসক্তদের আড্ডাখানায়। প্রশিক্ষণার্থীরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। স্থানীয়রা বলছেন— প্রশাসনের তত্ত্বাবধানের অভাবে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
সরেজমিনে দেখা যায়, সাত একর আয়তনের পিটিআই কমপ্লেক্সের ভেতরে চার বিঘা আয়তনের একটি পুকুর রয়েছে। নির্মাণাধীন একটি ভবনসহ মোট ছয়টি ভবন আছে। এর মধ্যে দুটি ভবনে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ৯০ জন আবাসিক প্রশিক্ষণার্থী থাকেন। বাকিগুলো কর্মকর্তাদের অফিস ও শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
পুকুরটি পুরোপুরি কচুরিপানায় ভরাট। পানি ঘন কালো রঙ ধারণ করেছে। এক ইজিবাইক চালক গাড়িতে লেগে থাকা পশুর বর্জ্য ওই পুকুরেই ধুচ্ছিলেন। দক্ষিণ পাশের ছোট ঘাটলাটি নির্মাণসামগ্রী ফেলে অচল করে রাখা হয়েছে।
শিক্ষক-শিক্ষিকা ও সুপারিন্টেনডেন্টের আবাসিক ভবনের চারপাশে ৩-৪ ফুট উঁচু জলাবদ্ধতার চিহ্ন দেখা যায়। মূল্যবান আসবাবপত্র পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। ভবনের দুই পাশে ছোট-বড় ঝোঁপঝাড় জমে রয়েছে, যা দেখতে পরিত্যক্ত বাড়ির মতো। পৌরসভার চার ফুট প্রস্থের একটি ড্রেন পিটিআইয়ের সীমানার ভেতরে এসে শেষ হয়েছে। সেখানে ময়লা-আবর্জনা জমে নর্দমায় রূপ নিয়েছে। পানির উপরে ঘন স্তরে ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ও মশা-মাছি জন্ম নিয়েছে।
আবাসিক ভবনের কিছুটা দূরে সীমানা প্রাচীরের প্রায় ১২ ফুট অংশ কে বা কারা ভেঙে ইট-পাথর ও রড সরিয়ে ফেলেছে। এ অংশ দিয়ে যাতায়াতের জন্য বাঁশ, কাঠ ও ইট-পাথর ফেলে অস্থায়ী রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। ঘন ঘন মানুষের চলাচলের চিহ্ন স্পষ্ট। ভাঙা প্রাচীরের বাইরে একটি তালাবদ্ধ ছোট টিনঘর রয়েছে।
ভেতরে গেলে ইনস্ট্রাক্টর মিজবাহ উদ্দিন আহমেদ ও আরও দুজন কর্মকর্তার সামনে অপর এক ইনস্ট্রাক্টর খোয়াইকে বলেন, ওই ভাঙা অংশ দিয়েই মাদক আনা-নেওয়া হয়। সন্ধ্যার পর উঠতি বয়সী ছেলেরা ইয়াবা কেনার জন্য ভেতরে ঢুকে পড়ে। কয়েকদিন আগে আবাসিকের এক শিক্ষকের সাথে এক মাদক বিক্রেতার বাকবিত-া হয়। এতে তারা প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকেন। নারী প্রশিক্ষণার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
এ সময় মিজবাহ উদ্দিন বলেন, পৌরসভা অপরিকল্পিত ড্রেন তৈরি করেছে। পুরো শহরের পানি এসে আমাদের কমপাউন্ডে জমে থাকে। নেশাখোরদের বাইরে যেতে বললে তারা দারোয়ানকে মারতে আসে। আজ দিনের বেলা কয়েকজন ভেতরে ঢুকে ধূমপান করছিল। তখন আমি তাদের বলেছি— ‘তোমাদের এভাবে দেখতে ভালো লাগে না, এখান থেকে চলে যাও।’ পরে তারা চলে গেছে।
পিটিআই সুপারিন্টেনডেন্ট আইরিন পারভিন বলেন, পৌরসভার উন্নয়ন কাজের কারণে আমাদের প্রধান গেটটি সরিয়ে ফেলায় ছোট একটি গেট বসাতে হয়েছে। এতে অনধিকার প্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা করার মতো জনবলও নেই। সীমানা প্রাচীর নির্মাণের জন্য বহু চেষ্টা করেও সফল হতে পারিনি। তবে পুকুর ও ঝোপঝাড় পরিচ্ছন্ন করার জন্য বিডি ক্লিনের সাথে আলোচনা চলছে।
পিটিআই কমপ্লেক্সের সামনের বাসিন্দা ও শায়েস্তাগঞ্জ সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আজিজুল হাসান চৌধুরী শাহীন বলেন, কয়েক বছর আগেও পিটিআইয়ের ভেতরে প্রবেশ তো দূরের কথা; এর সামনে দাঁড়াতেও দেওয়া হতো না। পুকুরে কচুরিপানা ছিল না, স্বচ্ছ স্ফটিকের মতো পানি ছিল। ভবনের চারপাশে এরকম ঝোঁপঝাড় ছিল না, চারদিকে ফুলগাছ ও সৌন্দর্যবর্ধক বৃক্ষ ছিল। সন্ধ্যায় আলো জ্বলতো, প্রশিক্ষণে সংস্কৃতিচর্চার আয়োজন হতো, যা আশপাশে ছড়িয়ে পড়তো। এখন বিকেলের পরই পিটিআই অন্ধকারে ডুবে যায়। এ প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি দরকার। গত সোমবার বিকেলে পিটিআই পুকুরপাড়ে দেখা হলে ইউটিউব ও ফেসবুক কনটেন্ট ক্রিয়েটর ইমাদ আহমেদ অন্তর বলেন, আমি এখানে এসে ভিডিও তৈরি করে ৮ লাখ ফলোয়ার অর্জন করেছি। সেই দৃশ্যগুলো এখন আর নেই। পিটিআইয়ের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে গেছে। এখন আর এই জায়গায় ভিডিও বানাতে আসি না। পুকুরের পানিতে হাত দিলেই চর্মরোগ হয়। অথচ কয়েক বছর আগে একদিন আমি এখানকার পানিতে নেমে দৃশ্যধারণ করেছিলাম।
এ সময় তার সঙ্গে থাকা আরও দুজন তরুণ কনটেন্ট ক্রিয়েটর বলেন, আমরা এই পুকুরটিকে আগের রূপে ফিরতে দেখতে চাই।
