সাব্বিরের পরিবারে শোকের মাতম

সাব্বিরের পরিবারে শোকের মাতম
সাব্বিরের পরিবারে শোকের মাতম

এমএ আহমদ আজাদ, নবীগঞ্জ থেকে ॥ “বাছা তো আর ফিরে আইলো না— আমার ছেলেরে কেনে মারলো? তাও তো আমি জানলাম না। হত্যাকারীদের ফাঁসি দেখতে চাই।” একথাগুলো বলছিলেন নবীগঞ্জ উপজেলার রাধাপুর গ্রামে প্রতিপক্ষের হাতে নিহত সাব্বির মিয়ার বৃদ্ধ পিতা আব্দুর রউফ।

গতকাল বুধবার সরেজমিনে নিহতের বাড়িতে গেলে তিনি জানান, সাব্বির বোরো জমিতে চারা রোপন করতে গিয়েছিলেন। মারামারীর সময় তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এসব তথ্য দিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

এদিকে, গতকাল বুধবার সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়না তদন্ত শেষে গ্রামের বাড়িতে মরদেহ দাফন করা হয়েছে। ঘটনার দিন রাতে পুলিশ

রাধাপুর ও কাকুড়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করলেও এ ঘটনায় কোন মামলা দায়ের হয়নি।

স্থানীয়রা জানান, গত মঙ্গলবার ১০ টাকা টমটম ভাড়া নিয়ে বিরোধের জেরে রাধাপুর ও জামারগাঁওয়ের লোকজন মাইকে ঘোষণা দিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ঘন্টাব্যাপি সংঘর্ষে উভয়পক্ষ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করেন। সাব্বির মিয়া (৩৫) তখন কৃষিজমিতে কাজ করছিলেন। একা পেয়ে প্রতিপক্ষের লোকজন তাকে কুপিয়ে হত্যা করে।

গতকাল বুধবার কাকুড়া করিমপুরের চৌরাস্তায় গিয়ে দেখা যায়, অন্যান্যদিনের মতো শতশত টমটম নেই। স্থানটি ফাঁকা পড়ে আছে। এই চৌরাস্তায় দুইদিন আগে মূল ঘটনার সূত্রপাত হয়। কাকুড়া-করিমপুর গ্রামের টমটম চালক রাশেদ, সিএনজি চালক মোহাম্মদ আলী ও সিরাজুলের সাথে টমটম ভাড়া নিয়ে কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয় রাধাপুর গ্রামের ব্যবসায়ী আফজল মিয়ার।

নিহত সাব্বিরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারে লোকজনের মধ্যে শোকের মাতম চলছে। নিহত ছাব্বিরের দুই ছেলে ও স্ত্রী শোকে কাতর হয়ে আছেন। বড় ছেলে মাহমুদ (৭) জানায়, তার বাবা তাকে একটি শার্ট কিনে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। “এখন আমাকে কে শার্ট দিবে” বলে কান্নায় ভেঙে পড়ে ছেলেটি। সে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার চায়।

নিহত সাব্বিরের স্ত্রী আকলিমা বেগম বলেন, “আমিতো জামাই হারাইয়া কলঙ্কিনী। “তাইন কইলা খেত রোয়াইয়া, আইয়া ভাত খাইবা, গরম ভাত পাতিলে রইল, তাইনতো আইয়া খাইলা না, আমার জামাইর দোষ কিতা, তারা ছেদ (কুপ) মাইরা দুই পা কাইট্টা ফালাইছে, আমি দুই অবুঝ ছেলে লইয়া কই যাইতাম, কইয়া গেলায় না গো; আল্লাহ এদের ফাঁসি দেখাইবা” বলে অজ্ঞান হয়ে যান। এসময় মায়ের পাশে ছিল তিন বছরে ছোট ছেলে মাহদী। সে শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে কান্না করছিল।

রাধাপুর গ্রামের বাসিন্দা ইউপি সদস্য তোফাজ্জুল হোসেন বলেন, “ভাই কি বলবো সামান্য ১০ টাকার টমটম ভাড়ার লাগি আমার এলাকায় এত হানাহানি হয়েছে। মানুষ খুন হইছে, আহত হয়েছে ৫০ জনের মতো, তবুও আমাদের শিক্ষা হবে না।”

তিনি বলেন, “গরীব অসহায় যুবক সাব্বির কৃষি কাজ করছিল, তাকে জমি থেকে ধরে নিয়ে মারা হয়েছে। সে সংঘর্ষের মধ্যে ছিল না। আমরা গ্রামবাসী মিলে আজকে থানায় মামলা দেব।”

সাবেক ইউপি সদস্য ফখরুল ইসলাম বলেন, “আমরা বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ডের সড়ক দিয়ে চলতে পারি না। বিবিয়ানা চৌরাস্তায় গেলেই কাকুড়া করিমপুরের মানুষ আমাদের বিনা দোষে মারপিট করে। আমাদের গ্রামের ব্যবসায়ী আফজল মিয়ার কাছে ১০ টাকার জায়গায় ২০ টাকা টমটম ভাড়া চায়, না দিলে আবার মারামারি করেছে। আসামীদের ফাঁসি চাই।”

যাকে নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত, সেই ব্যবসায়ী আফজল মিয়া বলেন, “আমাকে কাকুড়া করিমপুরের চৌরাস্তায় কয়েকজন টমটম ও সিএনজি চালক মারধর করে টাকা পয়সা ছিনতাই করেছে। আমি তাদের কথা মতো টমটম ভাড়া ১০ টাকার জায়গায় ২০ টাকা দেইনি কেন? এসব খুনি মাদকসেবীদের বিচার চাই। এরা সবসময় চৌরাস্তায় বসে মদগাঁজা খায়, ছিনতাই মারামারি করে।”

নিহত সাব্বিরের লাশ দেখতে যান, হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ও জামায়াতে ইসলামী সিলেট মহানগর সেক্রেটারী মোঃ শাহজাহান আলী। তিনি পরিবারের সবাইকে শান্তনা দিয়ে বলেন, এই অন্যায় কাজ কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। মাত্র ১০ টাকার টমটম ভাড়া নিয়ে একটি খুন। অবিলম্বে খুনীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি।

নবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোঃ কামরুজ্জামান বলেন, “সংঘর্ষের ঘটনায় একজন নিহত হয়েছে, কিন্তু এখনও কেউ মামলা দেয়নি, আমরা সংঘর্ষে জড়িত উভয়গ্রামের মধ্যে অভিযান চালিয়ে ৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছি। এলাকায় পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”