ক্ষমতাভোগী ধণাঢ্যরা বিদেশযাপনে সাধারণ কর্মীর সংসারে অচলাবস্থা
খোয়াই রিপোর্ট: বানিয়াচং উপজেলা যুবলীগ সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ শাহজাহান মিয়া ৫ মাস যাবৎ কারাগারে। সংসারের ব্যয় মেটানোর একমাত্র অবলম্বন ক্ষুদ্র কাপড়ের দোকানটি তার তদারকির অভাবে বন্ধের উপক্রম। এমন সময়ে দুর্ঘটনায় হাত ভেঙে যাওয়া এক ছেলেসহ তিন সন্তান নিয়ে মহাবিপাকে পরেছেন শাহজাহানের স্ত্রী। পিত্রালয় থেকে ধারদেনা করে কোনরকম সংসার বাঁচিয়ে রাখছেন।
অন্যদিকে— বানিয়াচং উপজেলা পরিষদের অপসারিত চেয়ারম্যান ও জেলা যুবলীগ সভাপতি আবুল কাশেম চৌধুরী নেপালে অবকাশ যাপন করছেন। তাঁর পরিবারের পরিবেশ বিধ্বংসী ইটভাটাসহ কোন ব্যবসাই থেমে নেই। তবুও কারগারে থাকা নিরীহ শাহজাহানের স্ত্রী-সন্তানের খবর নেননি একবারের জন্যও।
যুবলীগ নেতা শাহজাহানের এক নিকটাত্মীয় খোয়াইকে বলেন, “শাহজাহান দোকান থুইয়্যা রাইতদিন এমপি মজিদ খান ও কাশেম ভাইয়ের কামলা দিছে, অহন তার ফুলাফুড়ি না হাইয়্যা মরে। তারা খবর লয় না।” ওই ব্যক্তি নিজের পরিচয় গোপন রাখতে বলেছেন।
একই উপজেলার এক আওয়ামী লীগ নেতা ও তাঁর ছাত্রলীগ করা ছেলে গ্রেপ্তার আতঙ্কে পলাতক। এই পরিবারটিতেও অর্থনৈতিক দৈন্যতা।
তাদের প্রতিবেশী এক ব্যবসায়ী দুঃখ করে বলেন, “বাফেপুতে ১৫ বছরে লীগের নামে ৫ ট্যাহাও কামাইছে না। অহন ফালাইয়্যা বেড়াইতাছে। আর যারা অঢেল সম্পদ কামাইছে, তাঁরা ভালা দিন কাটাইতাছে।”
এদিকে, হবিগঞ্জে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে কয়েকজন জেলে থাকলেও ক্ষমতাভোগী বিত্তবানদের বড় অংশ বিদেশে নিরাপদ আশ্রয়ে আছেন। আওয়ামী লীগের দুই নেতার বাড়িতে হাজার লোক খাইয়ে বিয়ে আয়োজন করতেও দেখা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হবিগঞ্জ জেলায় ১১ জন বৈষম্যবিরোধী ছাত্রজনতাকে হত্যা ও হামলার অভিযোগে ১৫টির অধিক মামলার আসামি প্রায় ৫ হাজার। গ্রেপ্তার হয়েছেন শতাধিক নেতাকর্মী। তাদের বেশিরভাগই টাকার অভাবে এলাকা ত্যাগ করতে না পেরে ধরা পড়েছেন। তাই বিপাকে পরিবার।
এদিকে, জেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের অর্ধশতাধিক নেতা ভারত হয়ে দুবাই, থাইল্যান্ড, ইংল্যান্ড, কানাডা, সিঙ্গাপুর, সৌদিআরব, কাতার ও কেনিয়াসহ বিভিন্ন দেশে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছেন। বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন। তাঁরা লোকেশন পর্যন্ত শেয়ার করে ফেসবুকে ফটো আপলোড করেন। কেউ কেউ উচ্চগতির ট্রেন-আকাশপথ ভ্রমণ, বিখ্যাত সমুদ্র সৈকত ও পাঁচতারকা হোটেলে দিনযাপনেরও ভিডিও দিচ্ছেন।
বিদেশের বিভিন্ন স্পটে যাদের ঘুরতে দেখা গেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন— সাবেক এমপি জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোঃ আবু জাহির, তাঁর ভাই মোঃ বদরুল আলম, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোঃ আলমগীর চৌধুরী, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোতাচ্ছিরুল ইসলাম ও আবুল কাশেম চৌধুরী, কোষাধ্যক্ষ মিজানুর রহমান শামীম, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাইদুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক ফয়জুর রহমান রবিন, জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য আব্দুল মুকিত, রিচি গ্রামের মহসিন মিয়া, ইংল্যান্ড প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ, সাবেক তিন এমপির ব্যক্তিগত সহকারি সুদীপ দাস, মোছাব্বির হোসেন বেলাল, সেলিম উদ্দিন প্রমুখ।
বিদেশ গিয়ে সমালোচিত
সম্প্রতি সাবেক এমপি মোঃ আবু জাহিরের ইংল্যান্ডের একটি জনসমাগমে যাওয়ার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুর রহমান রবিনকে দেখা গেছে কেনিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি বুলেট ট্রেন ও আকাশপথে ভ্রমণ এবং পাঁচতারকা হোটেলে অবকাশ যাপনের রিল ফেসবুকে শেয়ার করেন। যদিও দেশে আওয়ামী লীগের কর্মীদের গ্রেপ্তারের ছবি ফেসবুকে দিয়ে তাঁদের মুক্তির দাবি জানাচ্ছেন— কিন্তু দলের সুবিধাভোগী হয়েও বিপাকে থাকা অস্বচ্ছল কর্মীদের দিকে সহায়তার হাত না বাড়ানোয় ব্যাপকভাবে সমালোচিত হচ্ছেন। ভুক্তভোগী কর্মীরা ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে নেতাদের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
অনুরূপভাবে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাইদুর রহমান ও মহসিন মিয়াসহ কয়েকজন নেতাকে বিভিন্ন সময়ে ফেসবুকে ছবি আপলোড করতে দেখা গেছে। সৌদিআরব ও কাতার থেকে কয়েকজনের ২০ লাখ টাকার চুক্তিতে আদম বেপারির মাধ্যমে পর্তুগালগমন চেষ্টার খবর পাওয়া গেছে। সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত সহকারিদের বিলাসী জীবনঃ
হবিগঞ্জে আওয়ামী লীগের আমলে যতটা না আলোচনায় ছিলেন সংসদ সদস্যরা, তার চেয়ে বেশি সমালোচিত ছিলেন তাদের তিনজন ব্যক্তিগত সহকারি (পিএ)— মোছাব্বির হোসেন বেলাল, সুদীপ দাস ও সেলিম উদ্দিন। লোকমুখে প্রচার হয়েছে— তাঁরা শূন্য থেকে আজ কোটিপতি। এর মধ্যে সুদীপ দাস স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে কানাডায়, বেলালের নামে কানাডার একটি ফ্লাইটের টিকেট ৫ আগস্টের কয়েকদিন পর ফেসবুকে দেখা গেছে। অন্যদিকে সেলিম উদ্দিন কাতারে অবস্থান করছেন। তিনি মাঝেমধ্যেই ফেসবুক সমুদ্র সৈকতসহ দৃষ্টিনন্দন স্থানে দাঁড়িয়ে ছবি দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগের আমলে স্ত্রীকে সরকারি চাকুরি দিয়েছিলেন সেলিম। এই খাতের আয়ে তার সংসার চলছে দিব্যি।
খোলস পাল্টে নিরাপদে
লাখাই উপজেলার বুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক সম্পাদক খোকন চন্দ্র গোপের বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। এখন আওয়ামী লীগ পতনের পরও অন্য দলের নেতাদের সাথে সখ্যতা গড়ে নিরাপদে রয়েছেন। বুল্লা বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির নেতা হয়েছেন সম্প্রতি। অপরদিকে— একই উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ রেজা উদ্দিন আহমেদ দুলদুলসহ ত্যাগী নেতাকর্মী কয়েকজন কারাগারে যাওয়ায় টাকার অভাবে আর্থিক দৈন্যতায় পড়েছে তাদের পরিবার।
আওয়ামী লীগের ক্ষমতা খাটিয়ে বানিয়াচং উপজেলার সুবিদপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান হয়েছেন জয় কুমার দাশ। তাকেও নিয়মিত দাপ্তরিক কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের বিরুদ্ধে থেকেও আসেননি আইনের আওতায়। এরকম আরও অনেক আওয়ামী লীগ নেতা রয়েছেন— যারা ১৬ বছর প্রভাব খাটিয়ে সুবিধাভোগ করেও এখন নিরাপদ অবস্থান রয়েছেন।
স্বচ্ছ ইমেজ ও ত্যাগীদের ভাষ্য
এ ব্যাপারে কথা হলে হবিগঞ্জের প্রবীণ ও স্বচ্ছ ইমেজের এক আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, ‘হবিগঞ্জে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক প্রতিমন্ত্রী, দুই সংসদ সদস্য ও মেয়র একজন কারাগারে রয়েছেন। জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতিসহ দুই সংসদ সদস্য ও জেলা পরিষদ সদস্য এবং আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের প্রভাবশালী নেতারা বিদেশে। আওয়ামী লীগের নামে অনেক নেতা আঙুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হয়েছে। অথচ বিপদে সাধারণ কর্মীদের পাশে থাকছেন না কেউ। টাকা থাকা সত্বেও তাদের জীবনধারণে সহযোগিতা করছেন না। এজন্য চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।’
আওয়ামী লীগ করেছেন, তবে স্বচ্ছ ইমেজের কারণে তাকে কেউ হয়রাণী করেনি, কোন মামলায়ও তাঁর নাম দেওয়া হয়নি— এমন এক নেতা খোয়াইকে বলেন, ‘সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত সহকারি ও তাঁদের পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন নানাভাবে অঢেল সম্পদ অর্জন করেছেন। টাকার জোরে তারা দেশ থেকে চলে যেতে পারলেও সাধারণ নিরীহ কর্মীরা আজ বিপাকে। রাজনীতি করে টাকা কামানের সংস্কৃতি তৈরি হওয়ায় যেন— “কারো পৌষমাস আর কারও সর্বনাশ” অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এই সংস্কৃতি দূর করতে না পারলে এক সময় বাংলাদেশের রাজনীতি আরও কলুষিত হবে। ভাল মানুষ রাজনীতিতে আসবে না। সৎ-যোগ্য লোকজন জনসেবা থেকে দূরে থাকবে। এ পরিবেশে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের আত্মসমালোচনা জরুরী।”
