জেলায় শিক্ষার চিত্র ভয়াবহ
বদরুল আলম ॥ হাওর ও পাহাড়বেষ্টিত হবিগঞ্জে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পরীক্ষায় দিন দিন কমছে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা, সেই সাথে নেমে যাচ্ছে পাসের হার ও ভালো ফলের হারও। শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের ভাষায়— এটা করোনা-পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালে জেলায় এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থী পরীক্ষার্থী ছিল ২৮ হাজার ২৮০ জন। করোনা-পরবর্তী ‘অটোপাস’ সুবিধায় পাস করেছিল ২৬ হাজার ৯৪৩ জন। পাসের হার ছিল ৯৬.২৫ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১,০০৬ জন।
তবে ২০২২ সালে পরীক্ষার্থী কমে দাঁড়ায় ২৬ হাজার ৮৫৯ জনে। পাস করে ২০ হাজার ৮২৩ জন, পাসের হার ৭৭.৫৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১,৫৯৭ জন— যদিও তা ‘সহনীয় পতন’ হিসেবেই ধরা হয়েছিল।
২০২৩ সালে পরীক্ষার্থী ছিল ২৫ হাজার ৩৫ জন, পাস করেছে ১৮ হাজার ৫৯৬ জন। পাসের হার কমে দাঁড়ায় ৭৪.২৮ শতাংশে। জিপিএ-৫ পায় ৯৪১ জন।
সবচেয়ে বিপর্যয়কর চিত্র ২০২৫ সালে। শুধু এসএসসি পরীক্ষার্থী মাত্র ১৮ হাজার ১০৮ জন, যার মধ্যে পাস করেছে মাত্র ১১ হাজার ৭৯৫ জন। পাসের হার ৬৫.১৪ শতাংশে নেমে আসে। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৫৮২ জনে— যা চার বছরের ব্যবধানে প্রায় অর্ধেকেরও কম।
এই পতনের প্রভাব বোঝা যায় মাঠ পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। বানিয়াচং উপজেলার এলআর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০২৩ সালে ৯১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৮১ জন পাস করে (পাসের হার ৮৯.১%)। ২০২৪ সালে পরীক্ষার্থী কমে দাঁড়ায় ৬৮ জনে, পাশ করে ৬০ জন (৮৮.২৩%)। আর ২০২৫ সালে পাসের হার নেমে যায় ৭৬.১৯ শতাংশে (৬৪ জন পাস)।
প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন বলেন, “২৭টি পদের বিপরীতে মাত্র ১০ জন শিক্ষক নিয়ে শিক্ষার্থীদের মানসম্পন্ন পাঠদান অসম্ভব। উপরন্তু করোনা পরবর্তী ধাক্কা আমরা এখনও সামলাতে পারিনি।”
একই উপজেলার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ছাত্রী সংখ্যা ৬০০-এর বেশি, অথচ শিক্ষক আছেন মাত্র ৫ জন। এবার ১২৭ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছে ৯২ জন (পাসের হার ৭৯%)। প্রধান শিক্ষক চয় চন্দ্র সিংহ বলেন, “শ্রেণি শিক্ষক না থাকায় পাঠদান মুখ থুবড়ে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যত আরও ভয়াবহ হবে।”
জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, হবিগঞ্জের ৯৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬টিই সরকারি। প্রায় সব বিদ্যালয়েই শিক্ষক সংকট প্রকট। ফলাফল প্রতিবছর নিম্নমুখী হওয়াও তারই প্রতিফলন।
তবে জেলাজুড়ে এমন সংকটময় পরিস্থিতির পরও হবিগঞ্জ জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদটি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। বর্তমানে বিকেজিসি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফরিদা নাজমীন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এ পদে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে রয়েছেন। লাগাতার তিন দিন মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা ও সরাসরি কার্যালয়ে গিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জহুরচান বিবি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “শিক্ষকের দায়িত্বহীনতা, অভিভাবকদের উদাসীনতা, মোবাইল আসক্তি ও দুর্বল শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন— এই চারটি প্রধান কারণেই শিক্ষার এই অবস্থা।”
এ ব্যাপারে সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, “হবিগঞ্জে হাতে গোনা কয়েকটি স্কুল ভালো করছে, বাকিগুলোর অবস্থা করুণ। অধিকাংশ শিক্ষক নিয়মিত ক্লাসে যান না, সিলেবাস অনুযায়ী পড়ান না।”
তিনি বলেন, হাওর ও চা-বাগান অধ্যুষিত এলাকায় শিক্ষার হার ও মান দুই-ই নিম্নগামী। স্কুল কম, অবকাঠামো দুর্বল, শিক্ষক সংকট প্রকট। সামাজিক সংঘাত, মামলা-মোকদ্দমা ও ২০২২ সালের বন্যার পর দরিদ্রতা বেড়ে যাওয়াও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে কিংবা হাফেজি ও কওমি ধারায় চলে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “ভালো স্কুলের খোঁজে অনেকে সিলেট বা ঢাকায় চলে যাচ্ছে— তাদের ফলাফল হবিগঞ্জে যুক্ত না হওয়ায় পরিসংখ্যানে বাস্তবের প্রতিফলন ঘটছে না।”
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জেলা প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগকে সমন্বিত নজরদারি, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত নিয়োগ এবং সামাজিক অস্থিরতা রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
