কিবরিয়া হত্যা মামলায় জি কে গউছের নাম যুক্ত হয় আওয়ামী লীগের চাপে
আরিফ চৌধুরী ॥ সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলার অভিযোগপত্রে আওয়ামী লীগ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের চাপে হবিগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র জি কে গউছসহ বিএনপি নেতাদের নাম জড়ানো হয়েছিল বলে আদালতে সাক্ষ্য থেকে জানা গেছে।
অভিযোগপত্র দাখিলকারী তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মেহেরুন নেছা পারুল গত ৮ অক্টোবর সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকারের আদালতে সাক্ষ্য প্রদানের সময় এই তথ্য জানিয়েছেন।
স্থানীয় কয়েকজন সেলুন শ্রমিক ও কৃষক এ বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য না জানালেও, পুলিশ নিজেদের ধারণার ভিত্তিতে তাদের মামলায় সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে বলে পাবলিক সাক্ষীতে উঠে এসেছে।
গত ৭ অক্টোবর সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা এএসপি মেহেরুনকে আদালতে তোলা হয়। তবে ঢাকা থেকে আসার পথে তিনি চশমা আনতে ভুলে যাওয়ার কথা জানিয়ে নথি পড়তে অপারগতার কারণ দেখান। নির্ধারিত পরবর্তী তারিখেও (৮ অক্টোবর সকাল) তাকে আবার আদালতে হাজির করা হলে তিনি অসুস্থতার কথা বলেন। পরে আদালত কিছুটা বিশ্রামের সুযোগ দিয়ে তাঁর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন।
মেহেরুন আদালতে বলেন, “চতুর্থ দফার চার্জশিট দেওয়ার আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আমাকে ফোন করে সাবেক মেয়র জি কে গউছ, আরিফুল হকসহ বিএনপি নেতাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে বলেন। এতে অসম্মতি জানালে আমাকে মোবাইলে ধমক দেওয়া হয়। রাজনৈতিক চাপের মধ্যেই চার্জশিট জমা দিতে হয়েছে।”
জি কে গউছের আইনজীবী মোঃ শফিউল আলম ও ব্যারিস্টার মোহাম্মদ জাকারিয়ার সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। তাঁরা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে আরও কয়েকজন সেলুনকর্মী ও কৃষক আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
ব্যারিস্টার জাকারিয়া বলেন, “সাবেক তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যই প্রমাণ করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ এই নেতাদের মামলায় জড়ানো হয়েছিল। আওয়ামী লীগ ছাত্রজনতার আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাদের মুক্তি মিলেছে এবং প্রকৃত দোষীদের বিচারের আওতায় আনার পথ তৈরি হয়েছে।”
আদালত সূত্র জানায়, মামলার জামিনে থাকা আসামিদের মধ্যে সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র জিকে গউছ ও কারাগারে থাকা আসামিরা সাক্ষ্য গ্রহণকালে আদালতে উপস্থিত ছিলেন। অসুস্থ থাকায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর সময় প্রার্থনা করেছেন।
২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বৈদ্যের বাজারে একটি জনসভা শেষে বের হওয়ার পথে গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত হন শাহ এএমএস কিবরিয়া। চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে তিনি মারা যান। হামলায় তাঁর ভাতিজা শাহ মঞ্জুরুল হুদা, আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা আবদুর রহিম, আবুল হোসেন ও সিদ্দিক আলী নিহত এবং অন্তত ৭০ জন আহত হন।
ঘটনার পরদিন হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দুটি মামলা হয়। পরে মামলা দুটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তর করা হয়। তদন্ত শেষে ২০০৫ সালের ১৮ মার্চ শহীদ জিয়া স্মৃতি ও গবেষণা পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল কাইউমসহ ১০ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। ওই অভিযোগপত্রের বিষয়ে আদালতে নারাজি আবেদন করে বাদীপক্ষ। পরে মামলা পুনঃতদন্তের পর ২০১১ সালের ২০ জুন আসামির সংখ্যা বাড়িয়ে ২৬ জনের নামে দ্বিতীয় দফায় অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। এটি নিয়েও আপত্তি জানায় নিহত কিবরিয়ার পরিবার।
সর্বশেষ ২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর হবিগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে সম্পূরক অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। এতে নতুন করে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীসহ ৩৫ জনকে আসামি করা হয়। পরে ২০১৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।
মামলায় সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক ও হবিগঞ্জের সাবেক মেয়র জি কে গউছ, লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৩ জন জামিনে আছেন। অন্য অভিযুক্তদের মধ্যে সাতজন পলাতক এবং মিজানুর রহমান মিটু, হাফেজ সৈয়দ নাঈম আহমদ আরিফ ওরফে নিমু, মাওলানা শেখ ফরিদ আহমদ, আবদুল মাজেদ ভাট ওরফে ইউসুফ ভাট, আবু জান্দালসহ অন্যরা কারাগারে আছেন। আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কিবরিয়া হত্যা মামলায় ১৭১ জন সাক্ষী। এর মধ্যে মোট ৭১ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।
