নানামুখী সংকটে বানিয়াচং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়
বানিয়াচং প্রতিনিধি ॥ ছাত্রআন্দোলন ও শিক্ষক দ্বন্দ্বে সংকটে পড়েছে বানিয়াচং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়। আন্দোলন ঠেকাতে তিনজন শিক্ষককে বাধ্যতামূলক ছুটিতে রাখা ও শিক্ষার্থী কমে যাওয়াও এ সংকটের কারণ। এভাবে ঐতিহ্যবাহী এ বিদ্যাপিঠ সুনাম হারাচ্ছে।
পুরাতন কমিটি বিলুপ্ত করায় সরকার এডহক কমিটি গঠনের নির্দেশনা দিলেও বানিয়াচং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে এখন পর্যন্ত পুরাতন কমিটি বহাল আছে। এ পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ধরে রাখতে প্রাক্তণ শিক্ষার্থীরা গত সোমবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
জানা গেছে, গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাতের পর বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হায়দারুজ্জামান খান ধন মিয়া আত্মগোপনে চলে যান। পরে ২ সেপ্টেম্বর প্রধান শিক্ষকসহ কয়েকজন শিক্ষকের পদত্যাগের দাবিতে ছাত্রআন্দোলন শুরু হয়। দিনভর পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হলে সেনাবাহিনী ও উপজেলা প্রশাসন অভিভাবকদের সাথে আলোচনা করে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পারভীন আক্তার খানম, সহকারি প্রধান শিক্ষক শিরিন আক্তার ও সহকারি শিক্ষক নানু মিয়াকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। গণস্বাক্ষর দিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা চাকুরী থেকে বরখাস্তের জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার , টাকা তছরুপ ও শিক্ষার্থীদের সাথে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ দেয়। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে, গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠানে না এলেও প্রধান শিক্ষক পারভীন আক্তার খানম বাড়ি থেকেই অফিসিয়াল কাগজপত্রে স্বাক্ষর করে যাচ্ছেন। শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে যাওয়ায় খন্ডকালীন শিক্ষকরা ছাঁটাই হতে পারেন— এমন চিন্তায় গ্রুপিংয়ে জড়িয়েছেন তাঁরাও। এর জেরে গত ২৯ এপ্রিল কিছু বহিরাগত লোক বিদ্যালয় ছুটির প্রাক্কালে তিনটি গেটে তালা দিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রায় ২ ঘন্টা অবরোধ করে রাখে। পরে শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফিরতে বিলম্ব হওয়ায় অভিভাবকরা এসে তাদের বের করেন। এর আগে কয়েকবার প্রধান শিক্ষকের পক্ষে বিপক্ষে শিক্ষার্থীরা মারমুখী আচরণ করেছে।
অমি নামে সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী তাঁর বাবাকে অনুরোধ করেছে— তাকে যেন অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। সে জানায়, তার শাখায় ১১১ জন শিক্ষার্থী আছে। আন্দোলনের কারণে তার সহপাঠি তাকিয়া, নিহা, নাবিহা, অমি রিয়া পালসহ আরও কয়েকজন অন্য স্কুলে চলে গেছে। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসিন বলে, এই অবস্থার কারণে ভালো লাগে না, তাই স্কুলে আসতে মন চায় না।
কামালখানী মহল্লার প্রাক্তণ ছাত্র, বর্তমান অভিভাবক সাবেক ইউপি সদস্য মখলিছুর রহমান জানান, স্কুলের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। তাই তাঁর সপ্তম শ্রেনিপড়ুয়া মেয়ের টিসি নিয়ে পার্শ্ববর্তী একটি স্কুলে ভর্তি করিয়াছেন।
অফিস সহকারি পারভীন বেগম জানান, ২০২৪ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ছিল ১ হাজার ৮৩৮ জন, চলতি বছর শিক্ষার্থী কমে ১ হাজার ৪০০ জন। শাখা ৩টি কমে ১৮টি শাখা চলমান আছে। কর্মরত শিক্ষক আছেন ২৯ জন। এদের মধ্যে ৮ জন খন্ডকালীন শিক্ষক রয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানিয়েছেন, শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সবার আগে টিউশন বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মৌখিক আদেশে বিদ্যালয়ের রুটিন কাজ পরিচালনা করছেন সিনিয়র শিক্ষক গোলাম রব্বানী। তিনি বলেন, কেউ দোষ করে থাকলে প্রচলিত আইনে বিচার হবে। ম্যানেজিং কমিটিকে সাথে নিয়ে তাদের স্কুলে ফেরাতে আন্দোলন করেছি, কিন্তু প্রশাসন পরিস্থিতি বিবেচনায় সায় দেয়নি।
প্রধান শিক্ষক পারভীন আক্তার খানম বলেন, আতাউর রহমান নামে একজন খন্ডকালীন শিক্ষককে ছাত্রীদের অভিযোগের ভিত্তিতে বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারী থেকে মে মাস পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠেই ৫ আগস্টকে পুঁজি করে আন্দোলন করিয়েছেন। আর্থিক অনিয়ম বা দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি কিছু টাকা ধার নিয়েছিলেন, পরে তিনি সেই টাকা পরিশোধ করেছেন।
গ্রুপিং ও আন্দোলনের অভিযোগ নাকচ করে বলেন, কেউ কারও সম্মানহানী করলে প্রকৃতির নিয়মেই সে একদিন বিচারের মুখোমুখি হবে।
এ বিষয়ে ইউএনও মাহমুদা বেগম সাথী বলেন, কেউ ছুটিতে নয়, নিরাপত্তার কারণে ৩ জন শিক্ষককে স্কুলে আসতে বারণ করা হয়েছে। তিনি বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে জানিয়েছেন, তিনিও চান বিদ্যালয়ের সমস্যা দূর হোক। কিন্তু যার মাধ্যমে কাজ করবেন সেই প্রধান শিক্ষকতো স্কুলেই যেতে পারছেন না। তিনি দ্রুত এডহক কমিটি গঠনের তাগিদ দিয়েছেন।
