বিশ্বের সাজানো গোছানো মেগাসিটি সিঙ্গাপুর

বিশ্বের সাজানো গোছানো মেগাসিটি সিঙ্গাপুর
মার্লিয়ন উদ্যানের সামনে লেখক

উত্তম কুমার পাল হিমেল, সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে ॥ ভ্রমণ পিপাসুদের পছন্দের তালিকায় অন্যতম পৃথিবীতে ৬ মেঘাসিটির একটি সিঙ্গাপুর। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডার পর এশিয়া মহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও সার্বিক উন্নতির দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে এই দেশ।

মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে সিঙ্গাপুরে বাসে করে ৫ ঘন্টা ও আকাশপথে ৫৫ মিনিটের পথ। এ দুটি দেশের আবহাওয়ায়ও তেমন কোন তফাৎ নেই। রাতের ফ্লাইটে আমরা সেখান থেকে রওয়ানা হই।

আমার নেতৃত্বে ও ঢাকা প্রিমিয়ার কনসালটেন্ট ট্রাভেলস এর সত্ত্বাধিকারী অংশু বাবুর নেতৃত্বে সফরে আরও ছিলেন স্বপন, সলিল, মিঠ ও নিরূপম। মাত্র ৬ দিনের ভ্রমণ ছিল এটি। গন্তব্য সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দর। একে বলা হয় পৃথিবীর দ্বিতীয় সেরা বিমানবন্দর। সুবিশাল ৩টি টার্মিনাল রয়েছে এখানে। একটি টার্মিনাল থেকে অন্যটিতে যেতে ব্যবহার করতে হয় টার্মিনাল ট্রেন। কিছুক্ষণ পর পর বিমানবন্দর কর্মকর্তারা আপনাকে দিক নির্দেশনায় সাহায্য করবেন। টার্মিনালগুলোর একেকটি বিশাল শপিং মলের সমান।

সিঙ্গাপুর শহর এতই পরিকল্পিত যে— নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। ছোট শহরজুড়ে রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন পাতাল রেল। রাস্তাঘাট এত পরিচ্ছন্ন— দেখে মনে হয় ক’ দিন হল নির্মাণ হয়েছে। সিঙ্গাপুরের প্রধান ভাষা ইংরেজী। পাশাপাশি চীনা, মালয় ও তামিল ভাষারও প্রচলন রয়েছে।

সিঙ্গাপুরে অধিবাসীদের বেশিরভাগ চীনা বংশোদ্ভুত। এরপর রয়েছে মালয় ও ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভুত। প্রবাসীদের সংখ্যাও উল্লেখ করার মতো।

নিয়ম-শৃঙ্খলার দিক থেকে দেশটির তুলনা হয় না। কেউ কেউ মজা করে সিঙ্গাপুরকে ‘ফাইন সিটি’ বলে থাকেন। কারণ নিয়ম ভঙ্গ করলেই সিঙ্গাপুরে আপনাকে ফাইন (জরিমানা) গোণতে হবে।

ঘুরতে গিয়ে দেখা হল— প্রবাসী বাংলাদেশি বি-বাড়িয়ার মোঃ জাহাঙ্গীর মিয়ার সঙ্গে। সাত বছর ধরে তিনি দেশটিতে আছেন। সিঙ্গাপুরের নাগরিক এক নারীকে বিয়ে করে নিজেও দেশটিতে নাগরিকত্ব লাভ করেছেন। বাংলা খাবারের দোকান ‘ঢাকা হোটেলের’ একজন পরিচালক তিনি।

পরিচয়ের পর বললেন, চলেন বসে গল্প হবে। বলতে লাগলেন— সিঙ্গাপুর যে অল্প সময়ে চট করে উন্নতি করেছে; এমনটা নয়। যেদিন সিঙ্গাপুর মালয় থেকে আলাদা হয়ে গেল, তখন থেকেই দেশটির লোকজন দেশ গড়ার পরিকল্পনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ দেশের নিয়মকানুন অনেক স্বচ্ছ। বিভিন্ন গোত্রের মানুষ থাকলেও প্রতিটি নাগরিককে সমান চোখে দেখা হয়। কোনো কাজে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই। এখানে বর্ণবৈষম্যকে বড় অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। কারো প্রতি বৈষম্য মেনে নেওয়া হয় না।

এখানকার রাস্তাঘাট, দোকান, বাড়িগুলো দেখলে মনে হয়— কিছুক্ষণ আগেই রঙ করা হয়েছে।

সিঙ্গাপুরের লোকদের ব্যাপারে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর বলেন, তাঁরা অনেক মার্জিত ও সৌখিন। পুরো মাসে একটা শার্ট পড়বে। তবে সেটা অবশ্যই নামিধামী ব্র্যান্ডের হবে। বর্তমানে বাংলাদেশি কমিউনিটি ভালো অবস্থায় রয়েছে দেশটিতে।

নির্মাণশিল্পে কর্মরত মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার পরিতোষ বলেন, পরিচ্ছন্ন দেশ সিঙ্গাপুরে ১৪ বছর যাবৎ বসবাস করছি। অনেক বাংলাদেশি স্থায়ী নাগরিক হয়েছেন। ৩টি বাংলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। পাঠ্যসূচিতে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি বাংলা বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।  জীবন যাপনের খরচ মালয়েশিয়ার তুলনায় এখানে কিছুটা বেশি। বর্তমানে মালয়েশিয়ার মুদ্রামান কমে যাওয়ায় সিঙ্গাপুর ডলারের মান রিংগিতের তিনগুণে পৌঁছেছে।

এটি ছিল আমার প্রথম সিঙ্গাপুর ভ্রমণ। মাত্র কয়েক বছরে দেশটির বড়রকম পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। গোটা শহর একদিনেই ঘুরে শেষ করা যায়। তবে সময় নিয়ে ঘুরলে অনেক কিছু দেখা ও জানার আছে সিঙ্গাপুরে।

এশিয়ান এবং ইউরোপিয় সংস্কৃতির সংমিশ্রণে তৈরি বিশ্বের অন্যতম সেরা শহর সিঙ্গাপুর। ১৮১৯ সালে এই শহর ব্রিটিশ বাণিজ্য উপনিবেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। দেশ স্বাধীনের পর এটি সিঙ্গাপুর নামে পরিচিত হয়। বিশ্বের ব্যস্ততম বন্দরগুলোর মধ্যেও একটি এই শহর। এশিয়া মহাদেশে কেনাকাটার জন্য সবচেয়ে সুন্দর জায়গা সিঙ্গাপুর। এই শহর শুধুমাত্র কেনাকাটার জন্য জনপ্রিয় তা নয়; বরং এখানে কিছু সুন্দর জায়গা আছে যা আপনিও ঘুরে দেখতে পারেন।

অর্চার্ড রোড:

অর্চার্ড রোড হলো সিঙ্গাপুরের কেনাকাটার মূল কেন্দ্র। যেখানে স্থানীয়দের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকরাও আসেন। ক্রিসমাস অনেক বড় করে আয়োজন করা হয় এবং সাজানোর জন্য রেনডিয়ার্স পাম গাছও ব্যবহার করা হয়। জিঞ্জারব্রেড হাউস তেরি করা হয়— যার উপরে নকল তুষার গড়িয়ে পড়তে থাকে।

ওয়ার্ল্ড সেন্টোসা রিসোর্ট:

সিঙ্গাপুরে ঘোরার আরেকটি উল্লেখ্যযোগ্য জায়গা এটি। সিঙ্গাপুরে দক্ষিণ উপকূলের কাছের দ্বীপে অবস্থিত এই রিসোর্ট। যেখানে হোটেল, রেস্তেুারাঁ, ক্যাসিনো, থিম পার্কসহ সময়োপযোগী সবই রয়েছে। এই জায়গার মূল আকর্ষণগুলো হলো- সমুদ্র ও তার  চারপাশে কেন্দ্রীভূত মেরিন লাইফ পার্ক, ডলফিন আইল্যান্ড, একটি ওয়াটার পার্ক এবং অ্যাকোয়ারিয়াম। অন্যান্য আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে ইউনিভার্সাল স্টুডিও সিঙ্গাপুর এবং রাতের বিনোদন। বিশ্বের অন্যতম এই স্টুডিওটির সৌন্দর্য নিজ চোখে উপভোগ না করলে তা যেন অপূর্ণ থেকে যাবে।

ক্লার্ক কোয়ে:

ক্লার্ক কোয়ে সিঙ্গাপুরের ঐতিহ্যবাহী জায়গা। সিঙ্গাপুর নদীর মোহনায় অবস্থিত জেটি ১৯ শতকের শেষে শহরের বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল। বর্তমানে এটি আরও জাঁকজমক হয় উঠেছে। ট্রেন্ডি রেস্তোরাঁ, অনন্য বুটিক, পুশকার্ট বিক্রেতাও রয়েছে। যা এশিয়ান এবং ইউরোপীয় প্রভাবে মিশ্রিত। একমাত্র রাতের বেলা ক্লার্ক কোয়ে চকচকে নাইট স্পটে ভরা থাকে। এছাড়া বুগিজ মার্কেটে তুলনামুলক কেনাকাটা এবং মোস্তফা সেন্টারের চা না খেলে তো সিঙ্গাপুর ঘুরার মজাই পাওয়া যাবে না।

মাত্র ২ রাত ৩ দিনের অবস্থানের একটি সংক্ষিপ্ত ভ্রমণে যেটুকু অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে তা অবিস্মরণীয়। আসলে বাংলাদেশের বাইরে না গেলে বুঝাই যাবেনা যে— পৃথিবী এত সুন্দর। যদিও সিঙ্গাপুর সিটি পৃথিবীর একটি অন্যতম আর্টিফিশিয়াল সিটি হিসাবে পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে।