দেড় মাসেও হদিস নেই ভূমধ্যসাগরে নিখোঁজ ৩৮ তরুণের

দেড় মাসেও হদিস নেই ভূমধ্যসাগরে নিখোঁজ ৩৮ তরুণের

লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালির পথে রওনা হওয়ার এক মাস ২১ দিন পরও হবিগঞ্জের ৩৮ তরুণের কোনো খোঁজ মিলছে না। লিবিয়ার বেনগাজি ডিটেনশন সেন্টার, কুখ্যাত আল-কুইফিয়া কারাগার বা ইতালির কোনো কোস্ট পয়েন্ট, কোথাও তাদের সন্ধান পায়নি বাংলাদেশ দূতাবাস।

লিবিয়া ও ইতালির বাংলাদেশ দূতাবাস খোয়াইকে জানায়, সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। কোথাও তাদের সন্ধান মিলেনি। এ বিষয়ে অনুমান করেও কিছু বলার মতো পরিস্থিতি নয়। এমনও আশঙ্কা করা হচ্ছে তারা সাগরে ডুবে মারা গেছেন।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর লিবিয়ার ত্রিপলি থেকে ইতালির উদ্দেশ্যে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে চারটি নৌকা ছেড়ে যায়। এর মধ্যে একটি নৌকায় হবিগঞ্জের ৩৮ জনসহ প্রায় ৯০ জন ছিলেন, সেই নৌকাটিই নিখোঁজ হয়েছে। বাকি তিনটি নৌকা ইতালিতে পৌঁছেছে। নিখোঁজদের প্রতিটি পরিবার

ইতালি পাঠানোর আশায় স্থানীয় ‘আদম বেপারি’ হাসান মোল্লার হাতে ১৭ থেকে ২০ লাখ টাকা করে দিয়েছেন। এখন প্রিয়জনের মৃত্যুর আশঙ্কায় পরিবারগুলো আতঙ্কগ্রস্ত। ভয় ও অনিশ্চয়তার কারণে কেউ মুখ খুলছেন না, আইনি পদক্ষেপেও যাচ্ছেন না।

লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব মোঃ রাসেল মিয়া বৃহস্পতিবার খোয়াইকে বলেন, বেনগাজি ডিটেনশন সেন্টার ও কুখ্যাত আল-কুইফিয়া কারাগার, এ দুই জায়গায় খোঁজ করারই বাকি ছিল। গত পরশু সেখানেও গিয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এখন আমাদের বলার মতো কিছু নেই। ইতালিতে খোঁজ নিতে পারেন।

ইতালির রোমে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব আসিফ আনাম সিদ্দিকী খোয়াইকে বলেন, ইতালিতে বেশ কয়েকটি কোস্ট পয়েন্ট রয়েছে, যেসব পথ ধরে অভিবাসীরা প্রবেশ করে। কোনো কোস্ট পয়েন্টেই তাদের তথ্য মিলেনি। যদিও কখনো কখনো কোস্টগার্ডের অগোচরেও অভিবাসীরা ঢুকে পড়ে, কিন্তু তেমন হলে নিখোঁজরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করত। এখন যদি তাদের পাসপোর্টের কপি পাওয়া যায়, তাহলে আরেক দফা খোঁজ চালানো সম্ভব হবে।

ঘটনার পর লিবিয়ার প্রথম সচিব বলেছিলেন, এর আগেও গত মার্চ মাসে ১৫ জন বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগরে নিখোঁজ হয়েছিলেন। এতদিনেও তাদের খোঁজ মিলেনি। সবদিক বিবেচনা করে বলা যায়- দুই দফায় ৩৮ জন ও ১৫ জন নিখোঁজ হয়েছেন। আশঙ্কা করা হচ্ছে তারা সাগরে ডুবে মারা গেছেন।

স্থানীয়রা বলছেন, যদি নিখোঁজরা সত্যিই বেঁচে থাকত, তাহলে হাসান মোল্লা এতদিনে তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করাতেন। প্রতিটি পরিবার এখন উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। আমাদের ধারণা, হাসান মোল্লা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য প্রচার করে সবাইকে বিভ্রান্ত রাখছেন। এরপরও আরও ১০০ জনের নিকট থেকে ১৭ থেকে ১৮ লাখ টাকা করে নিয়ে তাদের মিশর নিয়েছেন। সেখান থেকে সৌদিআরব ও লিবিয়া হয়ে ইতালী যাওয়ার কথা।

ইতালি প্রবাসী এসকে নোমান বলেন, হাসান মোল্লা আমার এক রুমমেটকে ভয়েজ মেসেজে জানিয়েছেন, নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তিনিও ৩৮ জন যুবকের বিষয়ে কোনো তথ্য জানেন না। অথচ ইতালি পাঠানোর জন্য সাগরে পাঠানোর পর তিনি যেসব অসামঞ্জস্য তথ্য দিচ্ছেন, তা এলাকায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।

নিখোঁজ যুবকদের মধ্যে ১৩ জনের নাম পাওয়া গেছে। তারা হলেন- হবিগঞ্জ শহরে উমেদনগর এলাকার লকুছ মিয়া, আরমান আহমেদ ও বাবলু মিয়া, আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমভাগের মানু শাহ, পারভেজ মিয়া, পবলু মিয়া, বানিয়াচং উপজেলার যাত্রাপাশা মহল্লার আলফাজ মিয়া রনি, মোজাক্কির আহমেদ, সিয়াম জমাদার, মিজান হাসান, মজলিসপুরের সায়েম খান, আদমখানীর রবিন মিয়া ও এড়ালিয়াপাড়ার জসিম মিয়া। বাকিরা আজমিরীগঞ্জের পশ্চিমভাগ, জলসুখা ও বানিয়াচং উপজেলার তারাসই গ্রামসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা।

আজমিরীগঞ্জের পশ্চিমভাগ গ্রামের লিবিয়া প্রবাসী হাসান আশরাফ ওরফে হাসান মোল্লার মাধ্যমে ওই ৩৮ জন ১৭ থেকে ২০ লাখ টাকা করে দিয়ে ইতালি যাওয়ার উদ্যোগ নেন। পরিবারের সদস্যরা কিছু না জানালেও স্থানীয় বিশ্বস্থ সূত্র বলছে, হাসান মোল্লা নিখোঁজদের পরিবারের নিকট থেকে নেওয়া টাকা ফেরৎ দেওয়া শুরু করেছেন।