এবার লুট হচ্ছে সাদাবালু

এবার লুট হচ্ছে সাদাবালু
বাসাবাড়িসহ ভরাট কাজে সাদা বালি খুবই কার্যকর; তাই অবৈধভাবে সাদা বালু তুলে সাথে সাথেই বিক্রয় করা হচ্ছে।

এমএ আহমদ আজাদ, নবীগঞ্জ থেকে ॥ নবীগঞ্জে কুশিয়ারা নদী থেকে সাদাবালু লুটের হিড়িক পড়েছে। চিহ্নিত ও প্রভাবশালী বালুকারবারীদের নজর এখন এই নদীর দিকে। অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনে বৃদ্ধি পাচ্ছে নদীর ভাঙ্গন; বিপর্যস্ত হচ্ছে পরিবেশ।

দেশে পট পরিবর্তনের পরও থামেনি দীর্ঘদিন ধরে চলা বালু লুটপাট। নদীর ১০-১৫টি স্পট থেকে রোজ বালু তোলা হচ্ছে। বালুর বেশিরভাগই ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ৬ লেনের কাজে লাগলেও সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে।

জানা গেছে, ড্রেজার মেশিন ও নৌকা দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। খবর পেয়ে গত বুধবার ঘটনাস্থলে যায় সেনাবাহিনী; তবে তার আগেই বালু উত্তোলনকারীরা পালিয়ে যায়। সাদা বালু উত্তোলনকারী ঠিকাধারী প্রতিষ্ঠানের দাবি— তাঁরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে নির্দিষ্ট স্থান থেকে বালু উত্তোলন করছেন। সরকারি অনুমোদনে তাজাবাদ মৌজার জেএলনং ২১৯, দাগ নং- ১০০৩ ও দীঘলবাক মৌজার জেএল নং- ২৭ ও ০৮/২৫ দাগে বালু উত্তোলনের অনুমতি রয়েছে। যদিও সীমানা নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা রয়েছে।

এ ব্যাপারে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীন বলেন, সীমানা নির্ধারণের কোন উদ্যোগ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি। ওসমানীনগর উপজেলায় কুশিয়ারা নদীর অংশ থেকে বালু উত্তোলনে সরকারি কোন ইজারা নেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঠিকাধারী প্রতিষ্ঠান অবাণিজ্যিকভাবে কুশিয়ারা নদী থেকে সাদা বালু উত্তোলনের অনুমতি পেলেও নবীগঞ্জের সেই সাদাবালু বিক্রি হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে। সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের নাম করে নদী থেকে ড্রেজার মেশিনে উত্তোলন করা বালু বিক্রি হচ্ছে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জায়গায়। বাসাবাড়িসহ ভরাট কাজে সাদা বালি খুবই কার্যকর; তাই অবৈধভাবে সাদা বালু তুলে সাথে সাথেই বিক্রয় করা হচ্ছে।

সাদা বালু অবৈধ পন্থায় বাণিজ্যিকভাবে বিক্রয় করতে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী চক্র। নিয়ন্ত্রন করছে নবীগঞ্জ ও শেরপুর এলাকার প্রভাবশালীরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, নবীগঞ্জ উপজেলার দীঘলবাক, দুর্গাপুর, পাহাড়পুর ও পারকুল মধ্যবর্তী এলাকায় কুশিয়ারা নদীর উপর বৃহৎ ড্রেজার মেশিন বসিয়ে কুশিয়ারা নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। কাজ করছে শতাধিক শ্রমিক। কুশিয়ারা চরের দীঘলবাক, তাজাবাদ মৌজায় বালু উত্তোলন শেষে সেগুলোকে বড় নৌকায় করে এলাকার কৃষি জমিতে ও নদীর পারের কয়েকটি স্থানে নিয়ে স্তুপ করে রাখা হচ্ছে।

মহাসড়কের পাশে পিটুয়া গ্রামের কাছে কয়েকটি স্তুপ করে  রাখা সাদা বালু।

এছাড়া মেশিন নদীতে বসিয়ে কয়েক কিলোমিটার দূরে নেওয়া হচ্ছে পাইপদ্বারা। পারকুল বিদ্যুৎ পাওয়ার প্লান্টের সংলগ্ন স্থানে, মজলিশপুর, কুমারকাঁদা মন্দিরের নিকটে এবং দীঘলবাক এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সাদা বালু স্তুপ করে রেখে অবাধে বিক্রি করছে চক্রটি।

স্থানীয়রা বলছেন, রোজ লাখ লাখ টাকার বালু উঠছে নদী থেকে, নদীর তলদেশে বিশাল গর্ত তৈরি হচ্ছে। এজন্য নদী ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মোজাহিদ মিয়া বলেন, প্রতিনিয়ত অবৈধভাবে বালু উত্তোলন হলেও প্রশাসন নিরব। সাদা বালু তুলে নেওয়ায় নদী ও ফসলের জমি এখন হুমকিতে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

তারেক মিয়া বলেন, বালু উত্তোলনকারী চক্রটি শক্তিশালী হওয়ায় ভয়ে প্রতিবাদ করা যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর ভূমিকায় যাওয়ার বিকল্প নেই।

এ ব্যাপারে বাপা হবিগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে সাদা বালু উত্তোলন পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। এখনই এর ক্ষতিকর প্রভাব চোখে না পড়লেও পরবর্তীতে নদীতে বিস্তর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এ ব্যাপারে নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমীন বলেন, কোনোভাবে নদী থেকে অবৈধভাবে সাদা বালু উত্তোলন করতে দেওয়া হবে না। তবে অভিযানের খবর পেয়ে তারা সেখান থেকে সটকে পড়ে। বালু তোলার মূল হোতাদের ধরার চেষ্টা চলছে।

তিনি জানান, তাকে দুটি পক্ষ বালু উত্তোলনের বিষয়ে অবগত করলেও তাদের কাগজপত্র পরীক্ষা করা হচ্ছে। তারা অনুমতি পেয়েছেন কি না, পরিবেশ সম্মতভাবে তুলছেন কি না সেটা দেখার জন্য এবং সাদা বালু উত্তোলনে কোন অনুমতি না দেওয়ার জন্য নৌ-পরিবহন মন্ত্রনালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে।