চিকিৎসা বাণিজ্যের অস্ত্র ‘অটোচালক’
স্টাফ রিপোর্টার ॥ হবিগঞ্জ শহরে প্রতিনিয়ত রিকশা ও টমটম চালক দালালদের খপ্পরে পড়ছেন রোগীরা। তাদের ফাঁদে পা দিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা লোকজন নিঃস্ব হয়ে ফিরছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এজেন্ট/দালাল হিসেবে এখন রিকশা ও টমটম চালকরা কাজ করেন। এরকম একটি তালিকাও পাওয়া গেছে।
বেসরকারি হাসপাতাল মালিকদের ভাষ্য— এসব চালক যদি রোগী সরবরাহ না করে তাহলে হাসপাতাল ব্যবসা লাটে উঠবে। অন্যদিকে— রোগী দিয়ে রোজ হাজার টাকা কমিশন কামিয়ে নেন চালকরা। সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় ৪১টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। যার দুই তৃতীয়াংশের লাইসেন্স নবায়ন করা নেই। তারা অবৈধভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
অনুসন্ধান করে জানা গেছে, হবিগঞ্জ শহরে দুই শতাধিক রিকশা ও টমটম চালক রয়েছেন— যারা গ্রামের সহজ-সরল লোকদের ভালমানের স্বাস্থ্যসেবার প্রলোভন দিয়ে প্রতারণা করছেন। তাঁরা সাধারণ যাত্রীদের বহন করেন না। সদর হাসপাতালের আশপাশ, নতুন বাসস্ট্যান্ড, সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ড, উমেদনগর স্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন পয়েন্টে আসা যাওয়া করেন। রোগী দেখলেই নিজ থেকে সাহায্যের নামে তাদের নিয়ে যাচ্ছেন আগে থেকেই চুক্তি করা বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।
সেখানে নেওয়ার পর একটি পরীক্ষার তালিকা ধরিয়ে দিয়ে নিঃস্ব করা হয় রোগীকে। এমনও রোগী আছেন— যারা বাড়ি যাওয়ার সময় অন্যের কাছে হাত পেতে টাকা নিয়ে ফিরেন। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক রিকশাচালক বলেন, আমরা সাধারণ যাত্রী বহন করি না। সারাদিনে ২টি রোগী হলেই যথেষ্ঠ। তবে এ কাজে চালকরা রেফারকারী/প্ররোচনাকারী হিসেবে প্রতি রোগী থেকে কমপক্ষে ৩০০ টাকা পর্যন্ত কমিশন পায়। তিনি আরও বলেন, অনেক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার আমাদের অগ্রিম টাকা দিয়ে রাখে, যাতে অন্য কোথাও রোগী প্রেরণ না করি।
আরও চমকপ্রদ তথ্য মিলেছে দালালের তালিকা খতিয়ে দেখে। তাদের কমিশন, নাস্তা, রোগীর নাস্তা ইত্যাদি বাবদ টাকা ধরা রয়েছে। ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চোখ সাইনবোর্ড আর রঙিন গ্লাসের আড়ালে চলছে এসব রমরমা গলাকাটা ব্যবসা।
নাসিরনগর এলাকার আছিয়া বেগম জানান, তিনি সদর হাসপাতালে সার্জারী বিভাগের ডাক্তার দেখাতে এসেছিলেন। পরে হাসপাতাল থেকে বলা হয়— এই মুহুর্তে ডাক্তার নেই। এ সময় এক অপরিচিত লোক তার ছেলেকে বলে— সার্জারী বিভাগের ডাক্তার বাসস্ট্যান্ড বড় হাসপাতালে বসেন। তার কথায় বিশ্বাস করে এখানে (মায়ের হাসি ডায়াগনস্টিক) আসার পর মুখে মাস্ক পরা এক ডাক্তার ৫০০ টাকা ভিজিট নিয়ে সাড়ে চার হাজার টাকার পরীক্ষা দেন। তার কাছে মাত্র ৪ হাজার টাকা ছিল। সব টাকা তারা নিয়ে যায়। পরে তাদের কাছ থেকে ভাড়ার জন্য একশ’ টাকা চেয়ে নেন।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ওই নারীকে বলা হয়— “আপনার কোন সমস্যা নেই, সবকিছু ভাল আছে। কিছু ওষুধ দিচ্ছি। ক্রয় করে নিয়মিত সেবন করবেন।”
লাখাই উপজেলার শিবপুর থেকে আসা হবিব উল্যাহ (৬৫) বলেন, কোর্ট স্টেশন এলাকায় সিএনজি থেকে নামার পর আমি ও আমার স্ত্রী একটি রিকশায় উঠি। তখন রিকশাওয়ালা আমার কাছে জানতে চায়— কোথায় ডাক্তার দেখাব? আমি বললাম সদর হাসপাতালে। এরপর সে আমার কথা শুনে বলে, এখানকার সব ভাল ডাক্তার চলে গেছে একটি বেসরকারী হাসপাতালে। তারপর তার কথামতো ফায়ার সার্ভিস রোডের মাউন্ট এডোরা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যায়। সেখানে আমার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ৫ হাজার টাকা নিয়ে নেয় তারা। কয়েকটা ভিটামিন সিরাপ লিখে দিছে খাওয়ার জন্য। আমার স্ত্রীর নাকি কোন অসুখ নেই। অথচ ঢাকার এক ডাক্তার বলছে পিঠের হাড়ে ক্ষয় হয়েছে।
এদিকে, গতমাসে দুই নম্বর পুল এলাকার এক চায়ের দোকানী বাবুল মিয়াকে সদর হাসপাতাল থেকে একইভাবে টি পপুলার হাসপাতালে নিয়ে যায় এক দালাল। পরবর্তীতে বাবুলের পায়ে পচন ধরলে এনিয়ে দৈনিক খোয়াইয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদ প্রকাশের পর জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ নড়েচড়ে বসে এবং ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ রকম অসংখ্য বাবুল, আছিয়া আর হবিব উল্লাহ প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। কিন্তু এসব প্রতারকদের বিরুদ্ধে নেই কোন কার্যকর পদক্ষেপ।
এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) জেলা কমিটির সদস্য বাহার উদ্দিন বলেন, প্রতারকদের বিরুদ্ধে কঠিন আইন প্রয়োগ না করার কারণে তারা দেদারছে এসব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের উচিৎ— ঘনঘন অভিযান করে এসব দালাল/প্রতারকদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনী ব্যবস্থা নেওয়া।
