চিকিৎসায় প্রথম ও প্রধান প্রয়োজন মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ
শামীম আহছান : এমবিবিএস ও বিডিএস ডিগ্রীধারী ব্যতীত কোন ব্যক্তি ডাক্তার উপাধি ব্যবহার করতে পারেন না— এই দাবিসহ আরও কয়েকটি দাবিতে সম্প্রতি দেশের ডাক্তার এবং ইন্টার্নরা সর্বাত্মক ধর্মঘট পালন করছেন। এতে করে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীদের জরুরী চিকিৎসা সেবাসহ অন্যান্য সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে।
এর পূর্বে এ ব্যাপারে তাঁরা হাইকোর্টে একটি রিটি পিটিশন দায়ের করেছিলেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল মহামান্য হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছেন— এমবিবিএস ও বিডিএস ডিগ্রীধারী ব্যতীত অন্য কোন ব্যাক্তি ডাক্তার উপাধি ব্যবহার করতে পারবেন না বলে
এখন অন্যান্য দাবি নিয়ে ডাক্তাররা তাঁদের ধর্মঘট চালিয়ে যাচ্ছেন। ওই দাবিগুলো সরকারের উপর নির্ভরশীল। এ ব্যাপারে আমরা বিনীতভাবে ডাক্তার এবং ইন্টার্নদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই— আপনাদের দাবি-দাওয়ার বিষয়ে আমরা অবশ্যই সহানুভূতিশীল। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবার মতন একটি জরুরী বিষয় বন্ধ রেখে এভাবে আন্দোলন আপনাদের পেশার সাথে কতটুকু সঙ্গতিপূর্ণ তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
আমরা জানি— আমাদের দেশে অনেক মানবিক ডাক্তার রয়েছেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই আমরা দেখি, ডাক্তারদের দায়িত্বে গাফিলতি, সেবার চেয়ে অর্থকে প্রাধান্য দেওয়া, ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে তাঁদের নির্ধারিত ওষুধ প্রেসক্রাইবের বিনিময়ে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া, নির্ধারিত সময়ে সরকারি হাসপাতালে উপস্থিত না থাকা এবং ব্যক্তিগত চেম্বার প্র্যাকটিসকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘটনা।
আমরা খুশি হতাম— ডাক্তারদের দাবিদাওয়ার মধ্যে এ সমস্ত বিষয়ও আত্মপোলব্ধির মাধ্যমে যদি তাঁরা উন্নতির আশ্বাস দিতেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ডাক্তার হওয়ার সময় তাঁরা যে শপথবাক্য পাঠ করেন তা অনেক ক্ষেত্রেই মানেন না। অথচ এ পেশায় আসার আগে তাঁরা মানবিকতাকে উর্ধ্বে রাখার অঙ্গীকার করেছেন।
বিশেষ করে এই পেশার শুরুতেই তাঁদের গ্রামাঞ্চলে বা উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো হলেও তাঁরা অনেক ক্ষেত্রেই সেখানে দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করে শহরে ছুটে আসেন। অথচ এদেশের অধিকাংশ মানুষই গ্রামে বসবাস করে। এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা প্রায়শই সংবাদপত্রের পাতায় খবরাখবর দেখে থাকি। কিন্তু এগুলো নিয়ে ডাক্তারদের সংগঠন কখনই কোনকিছু বলেন না।
গত ৫৩ বছরে ডাক্তারদের যে দুটি সংগঠনের কার্যকলাপ আমরা দেখে আসছি, তাতে ডাক্তারদের পেশাগত দক্ষতা বা মানোন্নয়নকে গুরুত্ব না দিয়ে বদলী বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক দলের লেজুরভিত্তিক কর্মকাণ্ডই লক্ষনীয়। আমরা আশা করব, এখন যারা নতুন ডাক্তার হয়েছেন, বা হবেন— তাঁরা তাঁদের পূর্বসূরীদের অনৈতিক কাজগুলো থেকে বিরত থাকবেন। এর মধ্যেই আমাদের দেশে অনেক ভাল এবং নৈতিকতাসম্পন্ন ডাক্তার প্রচুর রয়েছেন। তাঁদেরকে দেখেও নতুনরা শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করবেন। মনে রাখতে হবে— একজন ডাক্তারের কাছে যখন রোগী আসে তখন সেই রোগী ডাক্তারের প্রতিটি কথা ও কাজকে অবশ্যই পালনীয় বলে মনে করেন। একজন রোগী তাঁর ক্ষমতার বাইরে গিয়েও ডাক্তারদের পরামর্শমত জীবন যাপন করেন।
পাশাপাশি আমরা আশা করব এদেশের জনগণের স্বাস্থ্যসেবায় তৃণমূল থেকে শহর পর্যন্ত যে সমস্ত ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো যেন জরুরীভিত্তিতে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করতে চাই— সারা বিশ্বে ডাক্তারদের সহযোগী হিসেবে নার্স ও মিডওয়াইফদের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা যদি এটিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন তাহলে দেশ এবং বিদেশে প্রচুর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে। যে চাহিদা কখনই শেষ হবে না।
একটি হিসেবে দেখা যায়, উন্নত বিশ্বে একজন ডাক্তারের সঙ্গে ৪/৫ জন নার্সের দরকার। এক্ষেত্রে আমাদের দেশে উল্টোটাই আমরা দেখে আসছি। অথচ একজন রোগীর চিকিৎসা সেবার বিভিন্ন পর্যায়ে নার্সের গুরুত্ব অপরিসীম। ভালমানের নার্স তৈরী করতে পারলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে— আমরা ফিলিপাইনের কথা উল্লেখ করতে পারি। সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফিলিপাইনী নার্সরা প্রচুর পরিমাণে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
লেখক: সম্পাদক, দৈনিক খোয়াই
